আপনি হয়ত গিনেস বুকের কথা শুনে থাকবেন আর একজন বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবে আপনার গিনেস বুকের যে রেকর্ডগুলো বাংলাদেশের দখলে আছে এটির সমন্ধে জানতে ইচ্ছা করে তাই আজকের আর্টিকেলে বাংলাদেশের যে রেকর্ডগুলো গিনেস বুকে রয়েছে সে বিষয়ে আলোচনা করা হবে।
গিনেস বুকের উৎপত্তি
বন্ধুদের আড্ডায় বিভিন্ন রেকর্ড নিয়ে বিতর্ক বহুল প্রচলিত একটি ঘটনায। গত শতকের পঞ্চাশের দশকে এমন একটি বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন নাইট উপাধি প্রাপ্ত স্যার ইউবিফার্ড , ইংল্যান্ডের ওয়েটফোর্ডস কাউন্টিতে বন্ধুদের সাথে শিকারের সময় সবচেয়ে দ্রুতগতির পাখি কোনটি তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছিল। একাধিক রেফারেন্স বই ঘেটেও কেউ এই প্রশ্নের কোন উত্তর বের করা সম্ভব হয়নি। স্যার ইউবিফার্ড ছিলেন বিখ্যাত গিনেস বিয়ারি ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ওই বিতর্কে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি নিজ প্রতিষ্ঠানের বিপণন বাড়াতে এক অভিনব আইডিয়ার জন্ম দেন। বিশ্বের বিভিন্ন ধরনের রেকর্ডগুলো একত্রিত করে গিনেস বুক অব রেকর্ডস নামে একটি বই সংকলনের সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
তার সেই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে ১৯৫৪ সালের ৩০ শে নভেম্বর লন্ডনের ফ্লিট স্ট্রিট এর একটি ছোট অফিসে গিনেস সুপারলেটিভস নামে একটি নতুন প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করা হয়। দিনের পর দিনে পরিক্রমায় প্রতিষ্ঠানটি ওয়াল্ড রেকর্ড হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। কেউ নতুন কোনো রেকর্ড স্থাপন কিংবা পুরনো রেকর্ড ভাংতে চাইলে প্রথমে তাকে গিনেস বুকের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করতে হয়। তারপর গিনেস প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সে রেকর্ডটি স্থাপন করা হয়। এমন নিবিড় পরীক্ষা-নিরীক্ষার কারণে গিনেজের ওই তালিকা বিশ্ব রেকর্ডের শ্রেষ্ঠতম রেফারেন্সে পরিণত হয়েছে। শুধু তাই না, বিশ্বরেকর্ড গড়ে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে তালিকায় নিজের নাম তোলা কতটা সম্মান এবং গৌরবের তা বোঝা যায় প্রতিবছর এটি অর্জনের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান যেসব অভিনব এবং ব্যতিক্রমী আয়োজন করে তা থেকে।
সহজ করে বলতে গেলে গিনেজ বুকে নাম তোলার মানে ইতিহাসের পাতায় নিজের নামটি স্থায়ী করে ফেলা।
এছাড়াও আপনি যদি গিনেস বুক বা গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান এবংকিভাবে গিনেস বুকে আবেদন করবেন এই সম্পর্কে জানতে চাইলে গিনেস বুক এই আমাদের এই আর্টিকেলটি পড়তে পারেন।
বাংলাদেশ যত রেকর্ড গিনেস বুকে
১ . মানব পতাকা
এই বিশ্বরেকর্ড বইয়ের পাতায় বাংলাদেশি বিভিন্ন ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান প্রায় ১০০ টি রেকর্ড স্থান পেয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে স্থাপিত রেকর্ড গুলোর মধ্যে বিশেষ সবচেয়ে বড় মানব পতাকা গড়ে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে স্থান করে নেয়ার রেকর্ডটি অন্যতম। ২০১৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস কে স্মরণ করে ২৭,১১৭ জন মানুষ নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানব পতাকা’ করা হয়েছিল জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে। লাল-সবুজের বিশ্বজয়’ শিরোনামে মুঠোফোন সেবা দাতা প্রতিষ্ঠান রবি আজিয়াটার এই আয়োজনের কৌশলগত অংশীদার ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। ২০১৪ সালের ৪ জানুয়ারি গিনেস বুক কর্তৃপক্ষ এই রেকর্ডের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করে।
২ . শাহ সিমেন্ট
তবে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ২০১৮ সালে শাহ সিমেন্ট শীর্ষক একটি সিমেন্ট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান স্থাপিত রেকর্ডটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতায় দেশে সর্বপ্রথম গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড করে শাহ সিমেন্ট। ২০০২ সালে যাত্রা শুরু করায় প্রতিষ্ঠান মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুর বাংলাদেশের বৃহত্তম সিমেন্ট কারখানা টি স্থাপন করে। এই কারখানায় বছরে প্রায় এক কোটি মেট্রিক টন আন্তজার্তিক মানে সিমেন্ট উৎপাদন করা হয়। ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের বৃহত্তম ভার্টিকাল রলিংমিল বা ভিআরএম এর স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। এই ভিআরএম প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদিত সিমেন্ট প্রচলিত পদ্ধতিতে উৎপাদিত সিমেন্টের তুলনায় উৎকৃষ্টমানের হয়। এই লক্ষ্যে তারা ডেনমার্কের এফ এলস মিথ নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে ওই ভিআরএম তৈরীর অর্ডার দেয়। অর্ডার অনুযায়ী তারা বিশ্বের বৃহত্তম ভিআরএম তৈরি করে।
এর গ্রাইন্ডিং টেবিলের ব্যাস ৮.০৮ মিটার বা সাড়ে ২৬ ফুট। এতে ব্যবহৃত একেক টি রোলারের ব্যাস ৮ ফুট ৭ ইঞ্চি। সিমেন্ট তৈরি কাচামাল গুড়ো করতে এই মেশিনে এমন ছয়টি বিশাল রোলার সংযুক্ত করা হয়েছে। এই যন্ত্রটি পরিচালনায় ব্যবহৃত গিয়ার বক্স টি ১১.৬ মেগাওয়াট শক্তি সরবরাহের সক্ষম। এর মাধ্যমে ঘন্টায় সর্বোচ্চ ৫০০ মেট্রিক টন সিমেন্ট উৎপাদন করা সম্ভব।এইট স্থাপনের পর ২০১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর গিনেস কর্তৃপক্ষ শাহ সিমেন্ট কে এই অনন্য রেকর্ড এর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করে। গিনেস রেকর্ডের স্বীকৃতি শতভাগ বাংলাদেশি মালিকানাধীন শাহ সিমেন্ট এর পাশাপাশি বাংলাদেশের শিল্প এবং প্রযুক্তি খাতের জন্য একটি যুগান্তকারী অর্জন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অনুপম নিদর্শন হিসেবে এই বিশ্ব রেকর্ড শাহ্ সিমেন্ট এর পাশাপাশি বাংলাদেশের অন্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো কেউ অনুপ্রেরণা যোগাবে।
৩ . ️বঙ্গবন্ধুর শস্যচিত্র
জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ও একটি রেকর্ড গিনেস বুকে রয়েছে সেটি হল, মুজিব বর্ষ উপলক্ষে। সেদিন বগুড়ার শেরপুরের বালেন্দা গ্রাম এ ধান ক্ষেতেেই তৈরি করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি। এটি গিনেস বুকে সর্ব বৃহওম শস্যচিত্র নামক যোগ করা হয়েছে। সেই ক্ষেতটির পরিমাণ ছিলো : ১০০ বিঘা। বেগুনি ও সবুজ রং এর ধানের চারার মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছিলো।
বি. দ্র : বেগুনি রং এর ধানের চারা গুলো আমাদের দেশে না থাকায় চীন থেকে আমদানী করা হয়েছিলো।
৪ . সাইকেল
সময় টি ছিলো ২০১৭ সাল এর ১৬ ই ডিসেম্বর। ঢাকার বসুন্ধরায় আবাসিকে জড়িত হয় দুই হাজারের বেশি সাইক্লিস্ট।
সেই বিজয় দিবসে তাদের লক্ষ ছিলো গিনেস বুকে আরেকটি রেকর্ড যুক্তা করা এবং দেশকে সম্মান অর্জন করানো। এই সকল সাইকেলিস্টরা একত্রিত হয়ে ৩০০ ফিট এর লাইন তৈরি করে বিডি সাইকেলিস্টের কর্তৃপক্ষ।
যার ফলে ‘Longest single line of bicycle moving’ যুক্ত হয় অন্য একটি বাংলাদেশের গিনেস বিশ্ব রেকর্ড।
তবে শেষে বিডি সাইকেলিস্টের কর্তৃপক্ষরা দুই হাজারের বেশি সাইক্লিস্ট দের মধ্যে ১ হাজার ১৮৬ সাইক্লিস্টকে বাছাই করে রেকর্ডে নাম দিয়ে ছিলেন। এই রেকর্ড তৈরিতে সব রকম সাহায্য সহযোগিতা করেছিলো বিডি সাইকেলিস্ট।
৫ . ️হাত ধোয়া
৫২৯৭০ জন মানুষ নিয়ে ২০০৯ সালের ১৫ অক্টোবরে ইউনিসেফ, লাইফবয় ও ব্র্যাকের উদ্যোগে বিশ্ব হাত ধোয়া দিবসে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে একসঙ্গে হাত ধুয়ে বিশ্ব রেকর্ড করে। পরে এই রেকর্ড টিও গিনেস বুকে যুক্ত করা হয়।
৬ . বড় ক্রিকেট ব্যাট
এই ব্যাটটির ছিলো : দৈর্ঘ্য ১১১ ফুট ও প্রস্থ ১২.৫ ফুট। যা ছিলো বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্রিকেট ব্যাট। এই ক্রিকেট ব্যাট তৈরি করে ৬৭ জন ছাত্রের সম্মলিত প্রচেস্টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এবং তৈরিতে সময় লাগে প্রায় ১৫ দিন।
৭️ . সুপার গ্র্যান্ড ফাদার
শুনতে অবাক করা হলেও ৫০০ এর বেশি নাতি – নাতনীর দাদা হয়ে মোহম্মদ রজব আলী রেকর্ড করেন। যা পরবর্তীতে সত্যতা যাচাই করে সুপার গ্র্যান্ড ফাদার হিসেবে নাম লেখা লেখা হয় গিনেস বুকে। তার বাড়ি ছিলো বগুড়াতে এবং তিনি ১১৫ বছর বয়সে মারা যান।
৮ . ️সবচেয়ে পাতলা জাতি
এই রেকর্ড টি খুবই ইউনিক রেকর্ড। আমাদের দেশের পুরুষদের গড় ওজন প্রতি মিটার ইস্কোয়ারে ২০.৫ কেজি আর নারীদের ক্ষেত্রে ২০.৪ কেজি। বি এম আই এই অনুযায়ী আমরাই হলাম বিশ্বের সবচেয়ে কম ওজনের মানুষ এবং অন্যদিকে সর্বোচ্চ মোটা মানুষের দেশ হলো নাউরুর জনগণ।
৯ . বাজনা বাজানো
সুদর্শন দাশ নামক এক বাঙ্গালির ঢোলবাধক টানা ২৭ ঘন্টা ঢোল বাজিয়ে গিনেস বুকে রেকর্ডে নাম লিখেয়াছেন। ২০১৭ সালের ২৫ শে জুলাই তার কাজটিকে গিনেসের বুকে স্বীকৃতি প্রদান করে।
১০ . ঢাকার রিকশা
গিনেসের বুকে রিকশার নগরী হিসেবে স্থান পেয়ে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার নাম। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি রিকশা চলাচল করে ঢাকাতে ১৫ মিলিয়ন মানুষের ঢাকার যাতায়াতের জন্য মোট ৪০% যানবাহন রিকশা কেন্দ্রিক। ঢাকাতে ৫ লক্ষ রিকশা চলাচল করে। পরিবেশ বান্ধব এই বাহন ঢাকাতে নারী ও শিশুদের প্রধান মাধ্যম। এমনই তথ্য দেয়া আছে ২০১৫ সালের গিনেস বুকের প্রকাশনায়।
১১ . মানব শিকল
২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পযর্ন্ত ১,০৫০ কিলোমিটার হাতে হাত রেখে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানব শিকলের আয়োজন করেছিলো। যেটি গিনেস বুকে নাম লিখিয়াছে।
১২. সবচেয়ে বড় স্ট্যাপলার পিনের চেইন
ঢাকাতে খন্দকার শিহাব নামক একটি ছেলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্ট্যাপলার পিনের চেইন তৈরি করেন। যেটি ৪২২ ফুট লম্বা। প্রায় ৮ মাস খাটনির পর তৈরি করেন, এটি ২৭,০০০ পিন দিয়ে তৈরি করা হয়েছিলো। তবে এটি তৈরিতে তার খরচ হয় মাএ ২৭০ টাকা। শিহাব প্রমাণ করেছেন যে, চেস্টা এবং অধ্যাবসায় মাধ্যমে বড় কিছুও করা সম্ভব।
১৩ . সবচেয়ে ঝাল মরিচ
মরিচের নাম ভূত জলকিয়া অন্য নাম নাগা মরিচ। জন্মস্থান : বাংলাদেশ। বর্তমানে এটি তার রেকর্ড হারিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার বূচটির মরিচের কাছে। তবে এর আগে নাগা মরিচই ছিলো পৃথিবীর সবচেয়ে ঝাল মরিচ।
১৪ . ৫ পাএের একই বাড়িতে বিয়ে
নরেন্দ্র নাথ ও তারামনি নাথের ৫ মেয়কে বিয়ে করেছেন, তারাপথ কর্মকার ও রাজানারী রায়ের ৫ ছেলে। তাদের এই বিয়েতে এক পরিবারের ভাইদের সঙ্গে আরেক পরিবারের মেয়েদের বিয়ের ক্ষেএে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে যাতে গিনেস বুকেও তাদের নাম উঠেছে।
১৫ . সর্বাধিক ঘনত্বের দেশ
আমাদের দেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাস করে ২৯১৮ জনেরও বেশি মানুষ। যেটি বিশ্বের অন্য কেনো দেশে বসবাস করে না।
১৬ . ওয়ানডে ক্রিকেট সবোর্চ্চ ছক্কা
আমাদের দেশে, আমাদেরই বিপক্ষে ১৫ বলে ১৫ টি ছক্কা মেরে ওয়ানডে ক্রিকেটে সবোর্চ্চ ছক্কা মারার রেকর্ড গড়েন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যান শেন ওয়াটসন।
১৭ . সবচেয়ে বড় শিলা
১৯৮৭ সালে এক ভয়ংকর এক শিলা বৃষ্টির আঘাত হানে। সেই শিলা বৃস্টির মধ্যে সবচেয়ে বড় শিলাটির ওজন ছিলো ১ কেজি। বিশ্বের কোথাও এতো বেশি ওজনের শিলা বৃষ্টি হয় নি। সেই বৃস্টিতে প্রাণ হারান ৯২ জন ব্যক্তি।
১৮ . টেবিল টেনিস
আমাদের দেশে জুবেরা রহমান মিলেনু জাতীয় টেবিল টেনিসের চ্যাম্পিয়ন শীপে ১৬ বার জিতে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি চ্যাম্পিয়ন হয়ে তিনি গিনেস বুকে নাম লিখেছেন।
গিনেসের বুকে বাংলাদেশের যতগুলো রেকর্ড আছে আমরা তার সব গুলো দেয়ার চেস্টা করছি, তারপর ও যদি কোন রেকর্ড বাদ পড়ে থাকে তাহলে আমাদের কমেন্ট বা ইমেল করে জানান পরে সেগুলো এড করে নেবো। আশা করি আপনাদের এই আর্টিকেল ভালো লেগেছে।