আজকে আমরা জানবো : তালেবান কারা, কিভাবে তালেবান উত্থান, আফগানিস্তান তালেবান, আফগানিস্তান তালেবানের উথান ও সমস্যা।
দীর্ঘ সময় ধরে আফগানিস্তানের নাগরীকরা যুদ্ধ করে আসছে। এইসব যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে তালেবান। মার্কিন যুক্তরাষ্টের মতো মিলিটারি শক্তিশালি দেশও ২০ বছর যাবত যুদ্ধ করে ও তালেবানকে পরাজিত করতে পারেনি। আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্টের সৈন্যদের প্রত্যাহারের পর মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই তালেবার এই দ্বিতীয়বারের পুরো আফগানিস্তান কন্ট্রোল করে নিয়েছে।
তালেবান কারা এবং কিভাবে তাদের উত্থান
১৯৯০ এর দশকের শুরুতে আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহারের পর উত্তর পাকিস্তানের তালেবান আন্দোলন শুরু হয়। ভাষায় তালেবান অর্থ ছাত্র। সৌদি আরবের অর্থায়নে পরিচালিত পাকিস্তানের বিভিন্ন মাদ্রাসাগুলোতে তালেবান আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল। প্রথমদিকে এই আন্দোলন মূলত পশতুনদের সংগ্রাম হিসেবে বিবেচিত হতো। পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের সীমান্তের দুই পাশেই জাতির বসবাস সে কারণে এসব অঞ্চলে তালেবানরা খুব দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। তখন তালেবান নেতারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে ক্ষমতায় গেলে তারা শান্তি এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে সেই সাথে
{ যিনি ৬০০০ এর বেশি মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়েছেন – জানতে আর্টিকেল টি পড়ে আসুন }
কঠোর শাসন জারি করবে। আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়ার পর আফগান মুজাহিদদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হয় তাদের কোন্দলের কারণে আফগানিস্তানের মানুষ আফগান মুজাহিদীনদের উপর বিরক্ত হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে তালেবান আন্দোলন শুরু হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ তাদেরকে সমর্থন জানিয়েছিল। ১৯৯৫ সালের মধ্যে তালেবানের ব্যাপক প্রসার ঘটে। সে বছর সেপ্টেম্বরে তারা ইরান সীমান্তবর্তী হেরাত অঞ্চল দখল করে। এর ঠিক এক বছর পর প্রেসিডেন্ট বুরহানুদ্দিন রাব্বানীর সরকারকে উৎখাত করে তালেবানরা আফগানিস্তান ইসলামিক আমিরাত প্রতিষ্ঠা করে। তৎকালীন তালেবান-সরকার ১৯৯৮ সালের মধ্যে আফগানিস্তানের ৯০ শতাংশ অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়েছিল। তালেবান কারা
সেসময় তালেবানদের জনপ্রিয়তা লাভ এর কয়েকটি কারণ হলো : প্রথমদিকে তারা দুর্নীতি দমনে সফলতা অর্জন করেছিল এবং সমাজে আইন শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তালেবান নিয়ন্ত্রিত রাস্তা ব্যবহার করে বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপদে ব্যবসা-বাণিজ্য করার সুযোগ দিয়েছিল। তারা অন্যদিকে শরিয়া আইন বাস্তবায়নের কারণে তালেবানরা অনেকের কাছেই জনপ্রিয়তা হারায় ২০০১ সালে টুইন টাওয়ারে হামলার পর এক মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট আফগানিস্থানে আক্রমণ চালায়। মাত্র দুই মাসের অভিযানের মাধ্যমে আমেরিকানরা জোর করে তালেবানদেরকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। তৎকালীন সিনিয়র তালেবান নেতারা পালিয়ে গিয়ে পাকিস্তানের কোয়েটা শহরে আশ্রয় নিয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। তালেবানদের বিদায়ের পর আমেরিকার সহায়তায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়। এর তিন বছর পর আসে আফগানিস্তানের নতুন সংবিধান। সেই সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং হামিদ কাজি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তখন থেকেই তালেবানরা নতুন করে সংগঠিত হতে থাকে।
তারা চাচ্ছিল আমেরিকান মদদপুষ্ট সরকারকে হটিয়ে আবারো ক্ষমতায় আসতে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ৮০ মিলিয়ন ডলার খরচ করে প্রশিক্ষণ দিয়ে আফগান আর্মি করে তোলে। তালেবান যোদ্ধাদের তুলনায় আফগান আর্মির সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় চারগুণ। আমেরিকানদের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত আফগান সরকার এবং আফগান আর্মির বিপক্ষে তালেবানরা দীর্ঘসময় গৃহযুদ্ধে লিপ্ত ছিল আফগানিস্তানের বিপুল পরিমাণ বিদেশী সেনা থাকাকালীন তালেবানরা তাদের শক্তি বৃদ্ধি করে যাচ্ছে। শক্তি প্রদর্শন করতে তারা বহুবার কাবুলে হামলা চালিয়েছে। তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা হলেন মোল্লা মোহাম্মদ ওমর। ২০১৩ সালে তিনি মারা যাওয়ার পর দুই বছর পর্যন্ত এই খবর গোপন রাখা হয়েছিল। তখন তালেবানের নেতৃত্ব নিয়ে অন্তঃকোন্দল শুরু হয়।
২০১৫ সালে মোল্লা ওমরের সহকারি মোল্লা মনসুরের নেতৃত্বে তালেবানরা ঐক্যবদ্ধ হয়। ঐ সময়টাতেই তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর দখলে নেয়। ২০১৬ সালে মোল্লা মনসুর মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হয় এরপর মৌলভী আখুন্দজাদা তালেবানের শীর্ষ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হন। এখনো পর্যন্ত তিনি তালেবানের প্রধান নেতৃত্বে রয়েছেন বর্তমান তালেবানের আরো কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মোল্লা ওমরের ছেলে মো ইয়াকুব হাক্কানি। বর্তমান নেতারা দিনহাটা নি এবং তালেবান প্রতিষ্ঠাতাদের একজন আব্দুল গনি বারাদার। তিনি সংগঠনটি রাজনৈতিক শাখার প্রধান কারাবাস এবং দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন শেষে আবদুল ঘানি বারাদারকে বছর পর বিজয়ীর বেশে দেশে ফিরেছেন।
{ অনলাইনে আয় করার সহজ ৫ টি উপায় – জানতে আর্টিকেল টি পড়ে আসুন }
তালেবানরা নতুন করে আফগানিস্তানে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে যে নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া চলছে ধারণা করা হচ্ছে। আব্দুল গনি বারাদার সেই সরকারের প্রধান হতে যাচ্ছেন। তালেবানের অর্থায়নের একটি বড় উৎস হল মাদক ব্যবসা। তালেবানদের প্রয়োজনীয় অর্থের অনেকটাই আসে পপি চাষ এবং আফিম বাণিজ্যের মাধ্যমে। এছাড়া বেশকিছু দেশ তালেবানদেরকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেছে। ইরান, রাশিয়া, সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের দিকে সেই অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। তবে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ধারণা করা হয় সংগঠনটি যাত্রা শুরু করার সময় খোদ আমেরিকায় তালেবানকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র এবং অর্থ দিয়ে সহায়তা করেছে। তালেবানদের বিরুদ্ধে দেশে-বিদেশে বহু অভিযোগ রয়েছে অতীতে তালেবান সরকারের আমলে আল-কায়দা এবং এই সংগঠনের নেতা ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দিয়েছিল। তারা সেই অভিযোগের কারণেই মূলত আফগানিস্তানে হামলা চালিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এছাড়া তালেবানের বোমা হামলা এবং বিচ্ছিন্ন আক্রমণে বহু সাধারণ নাগরিক খুন হয়েছে।
সাংবাদিক, বিচারক শান্তির জন্য আন্দোলনকারী এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা নারীদেরকে তালেবানরা টার্গেট করে হত্যা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র বলত, তারা কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনের সাথে আলোচনায় বসে না কিন্তু ২০১৮ সালে তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি আলোচনা শুরু হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালে কাতারের রাজধানী দোহায় দুই পক্ষের মধ্যে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই চুক্তির শর্ত ছিল, যুক্তরাষ্ট্র-আফগানিস্তান থেকে তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করবে তার বদলে তালেবান-মার্কিন বাহিনীর উপর আর কোন হামলা চালাবে না সেইসাথে আল-কায়দাসহ অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনকে তালেবান নিয়ন্ত্রিত এলাকায় আশ্রয় দেওয়া যাবে না।
নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০২১ সালের এপ্রিলে ঘোষণা করেন যে সব মার্কিন সেনা ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আফগানিস্তান ছাড়বে। মে মাস থেকে সেনারা আফগানিস্তানে ত্যাগ করতে শুরু করে, জুলাই মাসের প্রথম দিকে আমেরিকানরা তাদের আফগান সহযোগীদের কে কিছু না জানিয়ে বাগরাম সেনাঘাঁটি খালি করে রাতের আধারে একপ্রকার পালিয়ে যায়। মার্কিনদের প্রধান সামরিক ঘাঁটি মার্কিন সেনারা দেশ ত্যাগের পর থেকে তালেবানরা নতুন করে আফগানিস্থান জুড়ে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। আগস্ট ১৬ তারিখে তালেবানরা প্রথম কোন প্রদেশের রাজধানী দখল করতে সক্ষম হয় এরপর থেকে বড় বড় শহর নিমিষেই দখল করে নেয় এরপর তারা রাজধানী কাবুলের দিকে অগ্রসর হয়। তালেবানরা কাবুলে প্রবেশের পর আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। পুরো দেশ দখলে নেয়ার পর তালেবানরা সংবাদ সম্মেলন করে তাদের নতুন পরিকল্পনা সম্পর্কে জানান দেয়।
দীর্ঘ দুই দশক ধরে বিশ্বের একমাত্র সুপার পাওয়ারের সঙ্গে লড়াই করে তালেবানরা শুধু টিকে থাকেনি বরং তারা আগের চেয়েও বহু গুণ শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছে। অতীতে তালেবানরা আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদেরকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এবার নতুন সরকার গঠনের পর কারা কারা তালেবানকে স্বীকৃতি দেয় সেটাই দেখার বিষয়। তালেবানরা আফগানিস্তানের দৃশ্যপটে হাজির হওয়ার বহু আগে থেকে দেশটিতে চূড়ান্ত রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং গৃহযুদ্ধ বিরাজ করছিল।
আশা করি তালেবান কারা এই সম্পর্কে একটি ধারণা পেয়ে গেছেন।