অরোরা বা মেরুজ্যোতি কী? কিভাবে তৈরি হয়?

আজকে আমরা জানবো : অরোরা বা মেরুজ্যোতি কীঅরোরা বা মেরুজ্যোতি কিভাবে তৈরি হয়অরোরা কোথায় দেখা যায় এইসব নিয়ে বিস্তারিত জানতে হলে আপনাকে আমাদের আজকের আর্টিকেলর্টি সম্পূর্ণ পড়ুন।

অরোরা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সুন্দরতম প্রাকৃতিক আচরণ। মেরুর দেশের এলাকায় রাতের বেলা আকাশে এক ধরনের আলোর প্রদর্শনী দেখা যায়, আর একেই বলা হয় অরোরা এবং বাংলাতে হয় মেরুজ্যোতি। উত্তরের গেলার্ধের অরোরা কে বলা হয় ‘অরোরা বরিয়ালিস’ বা ‘নরর্থান লাইটস এবং পাশাপাশি দক্ষিণের গোলার্ধে অরোরা কে বলা হয় ‘অরোরা অস্টোলিস’ বা ‘সাউদার্ন’ লাইটস।

অরোরা বা মেরুজ্যোতি কী? কিভাবে তৈরি হয়

আমাদের পৃথিবীর চারদিকে ঘিরে রয়েছে অদৃশ্য চুম্বকের ক্ষেত্র। এই চুম্বকের ক্ষেত্র সৌরজগতের বিভিন্ন ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয় তা থেকে পৃথিবী কে রক্ষা করে। সূর্য থেকে আসা বিভিন্ন সক্রিয় কণা বা পরমাণু প্রতিনিয়ত আমাদের পৃথিবীতে অতিক্রম করছে। একে বলা হয় সোলার উইন্ডো বা সৌর বায়ু। এই সৌর বায়ু যখন আমাদের পৃথিবীর কাছাকাছি আসে তখন পৃথিবীর দুই মেরু এসব পরমাণুকে চৌম্বকীয় বলে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর দিকে টেনে আনে। সূর্য থেকে আসা পরমাণু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে বায়ুমন্ডলের গ্যাসের অনু পরমানুর সাথে বিক্রিয়া আর সেই বিক্রিয়ার ফলে বিভিন্ন রঙের আলো উৎপন্ন হয়। যা আমরা পৃথিবী থেকে অরোরা রুপে দেখতে পাই।

অরোরা মূলত সৌর বায়ুর সাথে অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন এর বিক্রিয়ায় উৎপন্ন হয়। এসব বিক্রিয়ায় ধরণ অবস্থানের পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন ধরনের রঙের আলো দেখা যায়। নাইট্রোজেন পরমাণুর মূলত নীল রং উৎপন্ন করে আবার দুইটি নাইট্রোজেন পরমাণুর একত্রে বিক্রিয়া করলে বেগুনি রং উৎপন্ন হয়। এছাড়া উচ্চতার উপরও অরোরার রঙের পার্থক্য দেখা যায়। ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০০ কিলো. মিটার উচ্চতায় অক্সিজেন পরমাণুর সবুজ রং নিঃসরণ করে আর এই বিক্রিয়াটি 240 কিলো. মিটার উচ্চতায় সম্পন্ন হয় তখন অক্সিজেন পরমাণু থেকে লালচে বর্ণের আলোর দেখা যায় আর যখন এই সব রঙ একে অপরের সাথে মিশে যায় তখন নতুন নতুন বিভিন্ন রঙের ঝরনা তৈরি হয়। মাঝে মাঝে পুরো অরোরার মাত্র একটি রঙের হতে পারে আবার কখনো বা এতে দেখা যায় রংধনুর সব কয়েকটি রং রয়েছে।

 

অরোরা বা মেরুজ্যোতি কী কিভাবে তৈরি হয়

মধ্যযুগের বিজ্ঞানী গ্যালিলিও মনে করতেন : পৃথিবীতে সূর্যের আলোর প্রতিফলনের কারণে অরোরা দেখা যায়। পরবর্তীতে ২০ শতাব্দীর শুরুর দিকে নরওয়ের বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান বাকল্যান্ড সর্বপ্রথম প্রমাণ করে বায়ু মন্ডলের পরমাণুই অরোরা সৃষ্টির জন্য দায়ী। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ এই অরোরা পর্যবেক্ষণ করে আসছে। থৃস্টাপূর্বের ৩০ হাজার বছর আগের একটি গুহা চিত্রের আদিম কালের মানুষের অরোরা পর্যবেক্ষণ এর প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে প্রাচীনকালের অরোরা সবচেয়ে নিখুঁত বর্ণনা পাওয়া যাচ্ছে ২৬০০ সালের আগের এক চীনা পাণ্ডুলিপিতে। সেখানে অরোরাকে তীব্র বজ্রপাতের সাথে তুলনা করা হয়েছে। { কমোডো ড্রাগন কী? কমোডো ড্রাগন মানুষ খায়? জানতে হলে – এই আরটিকেলটি পড়ুন }

প্রাচীনকালের অরোরার কেন্দ্রিক বহু কুসংস্কার প্রচলিত ছিল। কোন কোন সমাজের মানুষ মনে করত তাদের পূর্ব পুরুষেরা আকাশের নাচানাচি করার ফলে এমন আলোর খেলা দেখা যায়। যে সৌর বায়ু সুন্দর অরোরা সৃষ্টির জন্য দায়ী তা আবার একই সাথে বেশ কিছু ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। পৃথিবী পৃষ্ঠের সূর্যের এসব ধনাত্মক আধানযুক্ত কণা স্যাটেলাইট যোগাযোগের জন্য বাধা সৃষ্টি করে ফলে রেডিও-টেলিভিশন টেলিফোন বা নেভিগেশন ব্যবস্থায় মারাত্মক সমস্যা দেখা দেয়। এমনকি কখনো এসব সৌর বায়ু বৈদ্যুতিক ঢেউ সৃষ্টি করে যা কোনো বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। পৃথিবীর মাঝ বরাবর তীব্র চৌম্বকীয় আকর্ষণ না থাকার কারণে শুধুমাত্র উত্তর ও দক্ষিণ মেরু কে কেন্দ্র করে অরোরা সৃষ্টি হয়। তাই দুই মেরু অঞ্চলের প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই আলোর প্রদর্শনী দেখা যায়। তবে অনেক সময় এই অঞ্চলের বাহিরেও অনেক দূর পর্যন্ত অরোরা দেখা যেতে পারে।

 

অরোরা কোথায় দেখা যায়

নিজের চোখে অরোরা দেখতে হলে আপনাকে উত্তর অথবা দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি অঞ্চলে যেতে হবে। মার্চ এবং সেপ্টেম্বর মাসে সবচেয়ে বেশি অরোরা দেখা যায় কারণ বসন্ত ও শরৎকালের সবচেয়ে বেশি সৌর বায়ু পৃথিবীর মেরু অঞ্চলের বায়ুমন্ডলে আটকে যায়। অরোরা পর্যবেক্ষণের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় অঞ্চলগুলো হলো : আইসল্যান্ড, কানাডা ও আলাস্কা। এসব দেশের উল্লেখযোগ্য জায়গাগুলোর মধ্যে রয়েছে : আইসল্যান্ডের : ক্রির্ক জুফেল পর্বত ও বুবেল লজকানাডা : ইয়োলো নাইফ, উড বাফেলো জেসপার ন্যাশনাল পার্কআলাস্কার : ফেয়ার ব্যাংকস। এসব জায়গা ছাড়াও মেরু অঞ্চলের কাছাকাছি থাকা আলোক দূষণমুক্ত আরো বহু জায়গা থেকে অনিয়মিতভাবে অরোরা দেখা যায়।

আশা করি অরোরা বা মেরুজ্যোতি কী – এটি নিয়ে আপনাকে একটি ধারণা দিতে পেরেছি।

Post a Comment

Previous Post Next Post

যোগাযোগ ফর্ম