বাবরি মসজিদ ইতিহাস এবং বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কারণ

আজকে আমরা জানবো : বাবরি মসজিদ ইতিহাস, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কারণ, বাবরি মসজিদ কোথায় অবস্থিত, বাবরি মসজিদ কে নির্মাণ করে

 

বাবরি মসজিদ ইতিহাস এবং বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কারণ

হিন্দুদের বিশ্বাসমতে বাবরি মসজিদ যে জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছিল সেই জায়গাটি ছিল হিন্দু ধর্মের অবতার রামচন্দ্রের জন্ম স্থান এবং হিন্দুদের দাবি অতীতের রাম মন্দির ভেঙে তার উপর বাবরি মসজিদ তৈরি করা হয়েছে। এই বিষয়টি নিয়ে আঠারো শতক থেকে হিন্দু এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিতর্ক চলে আসছে। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর হিন্দু মৌলবাদীরা এই মসজিদে আক্রমণ করে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে। এর ফলশ্রুতিতে সমগ্র ভারত জুড়ে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি হয়। সেই দাঙ্গায় প্রায় দুই হাজারেরও অধিক লোক মারা যায় যাদের বেশির ভাগ মুসলিম। বাবরি মসজিদে হামলা ও ধ্বংসের এই ঘটনার পেছনের জড়িয়ে আছে কয়েকশ বছরের সাম্প্রদায়িক ক্ষোভ এবং একাধিক ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের ঘৃণ্য রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র।

১৮৫৩ সালে প্রথমবারের মতো বাবরি মসজিদ কে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রশাসনে মসজিদের আঙিনায় বেষ্টনী তৈরি করে হিন্দু ও মুসলিমদের উপশোনার জায়গা আলাদা করে দেয়। সে সময় বেষ্টনীর ভেতরের চত্তর মুসলিমদের জন্য এবং বাইরের চত্তর হিন্দুদের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত হয়। এরপর দীর্ঘদিন বাবরি মসজিদ কেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব কিছুটা স্তিমিত ছিল। বিগত শতকের শুরুর দিকে বাবরি মসজিদ বিতর্ক নতুন করে একাধিক কহলের জন্ম দেয়। ১৯৪৯ সালে হিন্দু মৌলবাদীরা গোপনে মসজিদের ভেতর একটি রাম মূর্তি স্থাপন করেন। মুসলিমরা এর প্রতিবাদ জানায় এবং হিন্দু মুসলিম উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে মামলা করে। সেই পরিস্থিতিতে ডান্ডা ঢোকাতে পুরো মসজিদটিকে সিলগালা করে দেয় ভারত সরকার। তখন মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশাধিকার পাওয়ার জন্য হিন্দু মুসলিম উভয় পক্ষই পুনরায় আদালতের দ্বারস্থ হয়।

পরবর্তীতে হাজার ১৯৮৪ সালে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ রামের জন্মস্থান উদ্ধার এবং তার সম্মানে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠার লক্ষে কমিটি গঠন করে। হিন্দুদের এই পদক্ষেপে নেতৃত্ব দেয় তৎকালীন বিজেপি নেতা পরবর্তী সময়ের ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদভানি। ১৯৮৬ সালের বিতর্কিত মসজিদের দরজা হিন্দুদের জন্য খুলে দেওয়ার আদেশ দেয়ায় জেলা বিচারক। মুসলিম রায়ের প্রতিবাদে বাবরি মসজিদ একশন কমিটি গঠন করে। হাজার ১৯৮৯ সালে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ মসজিদ সংলগ্ন জায়গায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে নতুন প্রচারণা শুরু করেন। এরপর ১৯৯০ সালে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কর্মীরা মসজিদের আংশিক ক্ষতি সাধন করে।  তখন রাষ্ট্রীয়ভাবে আলোচনার মাধ্যমে বিতর্ক সমাধানের চেষ্টা করা হলেও হিন্দুত্ববাদীরা সে প্রয়াস শেষ করে দেয়। { বাংলাদেশের সকল সিমের দরকারি কোড ২০২২ – জানতে এই আর্টিকেল টি পড়তে পারেন }

 

বাবরি মসজিদ ইতিহাস এবং বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কারণ

অবশেষে ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ভারতীয় জনতা পার্টি ও শিবসেনার সমর্থকরা বাবরি মসজিদ আক্রমণ চালিয়ে সম্পূর্ণ মসজিদটি ভেঙে ফেলে। বাপি মসজিদ ধ্বংসের সেই ঘৃণ্য ঘটনাকে উন্মুক্ত জনতার স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখানো হলেও এর পেছনে ছিল হিন্দু উগ্রবাদীদের দীর্ঘদিনের নীলনকশার। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বিজেপি-শিবসেনার প্রায় দেড় লক্ষ কর সেবক একটি শোভাযাত্রা বের করে। সেই শোভাযাত্রা বাবরি মসজিদ প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক রাজনৈতিক সমাবেশ শেষে শেষ হয়। সেদিন দুপুর ১২ টা পর্যন্ত সেই সমাবেশ চলার পর কয়েকজন কর সেবক বাবরি মসজিদের গম্বুজের উপর উঠে যায়। এরপর সহিংস হিন্দু জঙ্গিরা পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৬শ শতকের এই মসজিদটিকে ধুলিস্যাৎ করে দেয়। এত বড় একটি স্থাপনা সাধারন বিক্ষুব্ধ জনতার পক্ষের ধ্বংস করা কিছুতেই সম্ভব নয়।

পরবর্তীকালে অনুসন্ধানে দেখা যায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বিজেপির বেশকিছু নেতা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির এই নীল নকশার সাথে জড়িত। বাবরি মসজিদ ভাঙার পরবর্তী কয়েক মাসে অযোধ্যা শহর সমগ্র ভারত জুড়ে বহু মুসলিমদের হত্যা করে তাদের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় প্রায় ২ হাজার এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিক্রিয়ায় আরো প্রায় হাজার খানেক লোক নিহত হয়। এছাড়া এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায় ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শিকার হয়েছিল। লালকৃষ্ণ আদভানি, মুরলী মনোহর যোশী ও উমা ভারতী সহ এই ঘটনায় জড়িত অন্যান্য রাজনৈতিক নেতারা মুসলিমবিরোধী মানসিকতাকে কাজে লাগিয়ে বিপুলসংখ্যক হিন্দু ভোটারকে বিজেপির ভোট ব্যাংকে পরিণত করে। এর সুফল তারা পরবর্তী নির্বাচনে হাতেনাতে পায় লোকসভায় অধিকসংখ্যক আসন ও উত্তরপ্রদেশের বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে।

২০০৯ সালের নির্বাচন কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে আসে যে, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সাথে জড়িত ৬৮ জনের অধিকাংশ ছিল বিজেপি নেতা। তাছাড়া প্রতিবেদনটিতে উত্তর প্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং এর সমালোচনা করা হয়। কারণ ইমারত ভাঙার সময় অযোধ্যার পুলিশ ও প্রশাসনের নিস্ক্রিয় ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। উপরের মহলের ইশারা ছাড়া পুলিশের এত বড় অবহেলা কিছুতেই সম্ভব নয়। ২০০৫ সালে ভারতের সাবেক গোয়েন্দা প্রধান বলায় কৃষ্ণন ধর দাবি করেন যে বিজেপির ভিএইচপি এবং আরএসএস নেতারা ঘটনাটি ঘটার ১০ মাস পূর্বেই বাবরি মসজিদ ভাঙার পরিকল্পনা করেছিলেন। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের রেস পরবর্তী সময়ে ভারতের বেশকিছু দাঙ্গা ও হামলার ঘটনা ঘটে।

১৯৯২ সালের ডিসেম্বর এবং ১৯৯৩ সালের জানুয়ারি মাসে বোম্বে দাঙ্গা সম্পন্ন হবার ক্ষেত্রে শিবসেনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সেই দাঙ্গায় প্রায় ৯০০ জন নিহত হয় এবং প্রায় ৯ হাজার কোটি ভারতীয় রুপি সম্পদ বিনষ্ট হয়। এছাড়া ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের মত সন্ত্রাসী সংগঠন বাবরি মসজিদ ধ্বংস কে তাদের সন্ত্রাসী হামলার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। ভারতীয় আইন অনুযায়ী হিন্দু দেবতা আদালতে অভিযোগ দায়ের করতে পারে এবং হিন্দু দেবতার বিরুদ্ধেও আইনি লড়াই চালানো যায়। অযোধ্যার ভগবান রামকে শিশুর রুপে মানা হয়। রামের এই শিশু রুপ আইন অনুযায়ী নাবালক আর তাই অযোধ্যার মামলায় রামের প্রতিনিধিত্ব করে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতা ত্রিলোকে নাথ পান্ডে। এছাড়া এই মামলায় হিন্দুদের আরেকটি অংশ হলো নির্মহি আখারা নামের একটি গোষ্ঠী এবং এদের বিপক্ষে মুসলিমদের হয়ে মামলা লড়েছে সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড।

২০০২ সালের পর থেকে বাবরি মসজিদ সম্পর্কিত মামলায় নানা রকমের জটিলতা দেখা যায়। আদালতের নির্দেশে জরিপ চালিয়ে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ জানিয়েছিল, এই মসজিদের নিচে বা তলায় একটি প্রাচীন কাঠামো সন্ধান পাওয়া গেছে। কিন্তু সেই প্রাচীন কাঠামো কোন মন্দিরে অংশ কিনা-এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সুপ্রিম কোর্ট নিজেও মেনে নিয়েছে যে পূর্বের কোন মন্দির কে ভেঙে বাবরি মসজিদ তৈরি করা হয়েছিল বলে যে অভিযোগ রয়েছে তা কোনোভাবেই প্রমাণিত নয়।

তখন ২০১০ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট রায় দেন যে, স্থানটি নিয়ন্ত্রণ ভাগাভাগি করে দেওয়া উচিত। কোর্টের রায় অনুযায়ী তিন ভাগের ১ ভাগ মুসলমানদের, ১ ভাগ হিন্দুদের এবং বাকি ১ ভাগ নির্মহি আখারা গোষ্ঠীর কাছে দেওয়া হয়। সেই রায়ের বিরুদ্ধে হিন্দু ও মুসলিম দুই পক্ষই আপিল করা হয় সুপ্রিম কোর্ট হাই কোর্ট এর পূর্ববর্তী রায় বাতিল করেন। অবশেষে ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর বিতর্কিত পুরো জায়গাটি জুড়ে মন্দির নির্মাণ করার পক্ষেই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হয় এবং মসজিদ নির্মাণের জন্য সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড কে অযোধ্যায় বিকল্প জমি বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলা হয়। সুপ্রিম কোর্ট একটি দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সেই আদালত কোন রায় দিলে তা মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। কিন্তু অতীতে আদালত মসজিদ ভাঙ্গা কে গুরুতর অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করলেও আবার কিসের ভিত্তিতে সেই অপরাধীদের পক্ষেই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হলো বিষয়টি অনেকেরই বোধ গম্য নয়।

এই ছিলো বাবরি মসজিদ ইতিহাস এবং বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কারণ ।

Post a Comment

Previous Post Next Post

যোগাযোগ ফর্ম